ইয়ে মানে ইশে, সাপোজ ধরেন এইটা আপনার একটা ইশে নিয়ে রচনা (কমন পড়ে কিনা দেখেন)

১০৭৪৩পঠিত ...০৩:৪৪, ফেব্রুয়ারি ২৮, ২০১৬


মুদ্রাদোষ এর আসল অর্থ কি? কোথা থেকে এর উৎপত্তি এই প্রশ্নটা প্রায়ই মাথায় ঘোরে। মুদ্রাদোষ শুনলেই আমার মনে পড়ে ক্লাস ফাইভে পড়া লাইন ‘অর্থই সকল অনর্থের মূল’। না জানি কোন গরীব মনীষী বলেছিলেন কথাটা। যদিও মুদ্রা শুনলে টেকা টুকার কথা মাথায় আসে, কিন্তু মুদ্রাদোষ এর মধ্যে টেকাটুকার ব্যাপার নাই। এই মুদ্রা এসেছে ভঙ্গী অর্থে। নাচে যেমন মুদ্রা থাকে ঐটা মনে হয়। সহজ ব্যাপার সবাই যেটা জানি সেটা হল মুদ্রাদোষ আসলে ‘Subconscious repetative word or repetative jesture'. মানে মনের ভুলে কেউ কেউ যেসব শব্দ বা ভঙ্গী পুনরাবৃত্তি করে। আমার আশেপাশেই মানুষের যে কত রকম যে মুদ্রাদোষ আছে সেটা হিসাব করতে গেলে জিহ্বা ঝুলে যাবে। কিছু কমন মুদ্রাদোষ হচ্ছে এমন:



মনে করেন আপনার
খুবই কমন একটা মুদ্রাদোষ। মাঝে মাঝে বাক্যের মাঝখানে এমন ভাবে বসে যায় যে পুরা বাক্যের অর্থে প্যাচপুচ লেগে একটা ছ্যারাব্যারা হয়। মামাকে নিয়ে এক অর্থোপেডিক ডাক্তারের কাছে গিয়ে এক বৃদ্ধ রোগিকে বলতে শুনছিলাম, ‘মনে করেন আপ্নের পাছার নীচের থেকে ব্যাথা উইঠা আসে পিঠের দিকে...’। ডাক্তার ছিলেন মহিলা, যথারীতি কিঞ্চিত বিব্রত।

ধরেন আপনের
‘মনে করেন আপনের’ মত এটাও সমান পাওয়ারফুল ক্যাচাল তৈরি করতে পারে। উদাহরণ দিব? মিরপুর ১০ নাম্বার ফল মার্কেটে অফিস ফেরত এক লোক বলছিল, ‘১৬০ টাকা দিয়া একটা তরমুজ নিছি, ছোট্ট। বাসায় নেওয়ার পর আপ্নের ভাবী একাই খেয়ে ফেলল ধরেন আপনার বিচি শুদ্ধা।’

আপনার
আগের দুটোর মত এটাও ফানি মুদ্রাদোষ। কথা বেশি বলতে হয় এমন পেশার লোকজন এই মুদ্রাদোষ মাখায়ে কথার একদম ছাতু বের করে ফেলে। ‘আপনার ছেলে পেলে নিয়া আছি টেনশানে। কথা শুনে না, বুঝলেন? এদের পিছনে আপনার কম টাকা ঢালছি? তারপরেও দেখেন আপনার অবস্থা। রেজাল্ট তো খারাপ করেই, বড় ছেলেটার আবার আপনার মেয়ে নিয়া বদনাম আছে। আপনার বউরে বল্লাম তুমি তো বাসায় থাকো তুমি নজর দাও, সে বলে আপনার ছেলের বাবাই যদি নজরে না রাখে কেমন হবে। কি বলবো আপনার...’

বুঝছো
বহুল প্রচলিত আরেকটি মুদ্রাদোষ। শুনতে খারাপ লাগে না, তেমন প্যাঁচঘোচও লাগায় না। কিছুটা উপকারী বরং। সাধারনত যারা মাস্টারি করে তাদের মধ্যে বেশি ঢুকে যায় এটা। লম্বা লম্বা বাক্যের মাঝখানে ‘বুঝছো?’ না ঢুকালে মনে হয় লেকচার দিয়ে আরাম নাই। আমার কলেজের কেমিস্ট্রি স্যারের মুখে কয়েক কোটিবার ‘বুঝছো? শুনেও আমি কেমিস্ট্রিটা ঠিক বুঝি নাই। এখন এক কোচিং এর মাস্টারের মুখে বারবার ‘বুঝছো’ শুনি। বুঝছো'র আঞ্চলিক রূপগুলোও কিউট। আমাদের নোয়াখালীর অনেকে বলে ‘বুইজ্ঝোনি?’ চিটাগাংয়ে বলে ‘ন বুঝদ্দে?’ যশোরের এক পাগলা ছেলে খুব মিষ্টি করে বলতো ‘বুঝিছো?’ আর আমার বন্ধু গালিব এর এক চাচার ছিল ‘বোজো নাই?’

ইয়ে, ইশে
ঘরে ঘরেই পাওয়া যাবে এই দোষে দুষ্টলোক। এর ব্যাপারে বিতং করে বলার কিছু কি আছে ? আমরা অনেকে অনেক সময় নিজেই বলে ফেলি ‘ইয়ে, ইয়ের উপর থেকে ইশেটা দাও তো’। তবে এই ইয়ে ইশে এতই কমন যে একে দোষ হিসেবে ধরাও অনেকে বাদ দিয়েছে ইদানিং।

ধুরো
সম্ভবত এককালে এই শব্দটা ছিল ‘দুর হ’। কীভাবে জানি শব্দ দুটোর মাঝখানে এক ফোঁটা সুপারগ্লু পড়ে জোড়া লেগে হার্ড হয়ে ধুরো হয়ে গেছে। বিরক্তি প্রকাশের এই শব্দ অনেকেই বেশি বেশি ছাড়েন। অল্প বিস্তর মনে হয় আমি নিজেই করি।

যা তা
এক সময় যা তা বলতে ফালতু বুঝানো হত। কোনো এক সিস্টেমে মনে হয় টেকাটুকা খরচ করে এই শব্দ এখন অনেক পাওয়ারফুল হয়ে গেছে। এটা হাল জামানার দোষ। ইদানিংকালের তরুনদের বিস্ময়, বিরক্তি, পুলক, ভয় সব ধরনের আবেগ প্রকাশের মত স্থিতিস্থাপকতা আছে এই দুই শব্দের। অনেকটা আলু তরকারীর মতন। সব কিছুতেই যায়। তাই বেশি বেশি ঘষলেও ফেনা কমেনা। ধুত্তরী, কী থেকে কী বলতে শুরু করলাম। যা তা'র কথায় আসি, ‘যা তা’ যারা ব্যবহার করেন, তারা যা তা লেভেলে, যা তা জায়গায় যা তা বলতে থাকেন। যেমন--

: দোস্ত মালটা যা তা (মাল বলতে যে যার রুচি ও বয়স অনুযায়ী বুঝিয়া লইবেন, কর্তৃপক্ষের দায় নাই)।
: পরীক্ষার প্রশ্ন যা তা লেভেলে হার্ড হইছে।
: গানটা/মুভিটা যা তা (খারাপ না কিন্তু, জোশ বুঝানো হয়েছে)।
: যা তা পিনিক!
: যা তা লেভেলের কুল!

আরে
খুবই নির্দোষ এই শব্দটা খুব খারাপ। কমন না একদমই। অনেকেই আছে ‘আরে’ ছাড়া বাক্য শেষ করতে পারে না।

: আরে খাবার কই?
: আরে লাইট জ্বালানো কেন?
: আরে আসতেসি।
: আরে যাব না বলি নাই তো!
একটা সুক্ষ চাপা বিস্ময় বা প্রশ্নবোধক জোর আছে মনে হয় এই শব্দে।

হচ্ছে, হলো
এই দুই শব্দের একটাকে অনেকেই কথায় বাড়তি প্রয়োগ করেন। ‘আমি হচ্ছি গিয়ে জব করি’ ‘তুমি হলো তাকে বইল, ফোন করতে’ এমন কথা শোনা যায় প্রায়ই। আর খুব রেয়ার একজন হলেন আমার চারুকলার বাগেরহাটের এক বড়ভাই, তিনি এই দুইটাকেই টেপ মেরে এক সঙ্গে চালান। উনার কথা অনেকটা এরকম, ‘তুই হচ্ছে হলো কুবরিকের ছবিগুলা দেখিস’ ‘তারাশংকর হচ্ছে হলোগে আসলে বস একটা’।

ক্যারিক্যাচার : সাদাত খাঁটি বাংলায় এমন হাজার হাজার শব্দকে মুদ্রাদোষে দুষিত করা হয়েছে। যেমন: আসলে, সেটা বিষয় না, বিষয়টা হল, ঘটনা হচ্ছে, ব্যাপারটা হল, তারপরে ইত্যাদি। বাঙালিরা ইংরেজি ভাষাকেও মাফ দেয় নাই। দোষের কিল তারাও খেয়েছে। কমও না একদম। 

ওকে
সম্ভবত সবচেয়ে বেশি যেই ইংরেজী মুদ্রাদোষটা পাওয়া যাবে তা হচ্ছে ‘ওকে’।
: বলসি তো, ভালোবাসি ওকে?
: কাকে?
: তুমি বুঝো নাই ওকে?
: কাকে বুঝতে হবে?
: আমাকেই বুঝো নাই ওকে?
: তোমাকে বুঝবো ঠিকাছে, ওকেটা কে?
: কেউ না ওকে?
: ধুর!

এমন হয় বলব না, কিন্তু হতেও তো পারে, ওকে?

সাপোজ
এই ইংরেজী শব্দটা অনেকের জিহ্বায় আটকে গেছে। কিন্তু যারা এটা ব্যবহার করেন তাদের অনেকেই অবচেতনভাবে এর বাংলা অর্থটাকে পাশে বসিয়েই করেন। যেমন: ‘সাপোজ’ ‘ধরেন' আপনে গেলেন, তারে পাইলেন না, কি করবেন?

লিসেন
এটাও মাস্টারি বা বসিং টার্মে ফিট খায় বলে, এই লাইনের পাবলিকের মুখে আটকে থাকে বেশি। কথা মন দিয়ে শুনতে বলার জন্য কিন্তু না, অভ্যাসের বসে সাধারণ কথায়ও এই গুরুত্বারোপমূলক শব্দ ঢুকিয়ে দেন অনেকে--‘লিসেন তুমি যাও গা’ ‘লিসেন আমি খাব না’।

বেসিক্যালি
এক পরিচালক বড় ভাইয়ের আছে এই রেয়ার শব্দের অভ্যাস। উনি যখন খুব সিনসিয়ারলি কিছু বলেন সেটা এমন শোনায়, ‘বেসিক্যালি শটটা আমরা দেখি মিড লং এ, সেখানে বেসিক্যালি ছেলেটা বসে আছে এদিক ফিরে, বেসিক্যালি সে তেমন কিছুই করছে না, হয়ত। তারপর বেসিক্যালি আমারা তাকে ক্রস করে সামনে দেখি...।’

ইউ নো
এটি একটি কচি বয়সের দোষ। নিজেকে কুল দাবী করা জেনারেশানের নিজস্ব বাচনরীতিতে এই শব্দ ঢুকে গেঁড়ে বসছে। আধা বাংলা আর আধা ইংলিশ কথা জোড়া দিতে এই শব্দের বেশ ভালো দখল আছে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে ‘ইউনো’ কাজ করে স্কিপ ওয়ার্ড হিসাবে। ‘গেসিলাম ইউনো, খেলাম, মুভি দেখলাম ইউনো, বোরিং ইউনো যা হয় আরকি এইসব পার্টিতে’।

লাইক
এটা নতুন কানে আসা দোষ। কথার মাঝে হুদাই জায়গা নিয়ে বসে থাকে, কোনো কাজ নাই। হয়ত এর ব্যবহারে বক্তার কুলনেস বাড়ে, বেশি ব্যবহার করতে দেখি (থুক্কু শুনি) মেয়েদের। স্পেশালি কথায় রং ঢং চাপানো মেয়েদের এই শব্দ বেশি ব্যবহার করতে শোনা যায় এভাবে, ‘ওর কথা শুনে আই ওয়াজ লাইক টাশকি খেলাম। হি ওয়াজ লাইক কিচ্ছু হয় নাই এমন ভাবে তাকায় ছিল।’

আর লিখতে ইচ্ছা করছে না। ম্যালা লিখে ফেলেছি। বোরিং লাগছে এখন। কয়টা লিখব। কত্ত আছে এমন। সুশীলগুলা লিখেই শেষ করতে পারছি না। আরও তো কত রয়ে গেছে। এই অবস্থায় মনে পড়ল খুলনার এপিক একটা মুদ্রাদোষ, ‘লিখতে লিখতে মরে গেলাম বাড়া...।’

১০৭৪৩পঠিত ...০৩:৪৪, ফেব্রুয়ারি ২৮, ২০১৬

আরও

পাঠকের মন্তব্য ( ৪ )

 

    ইহাতে মন্তব্য প্রদান বন্ধ রয়েছে

    আপনার পরিচয় গোপন রাখতে
    আমি নীতিমালা মেনে মন্তব্য করছি।

    আইডিয়া

    গল্প

    সঙবাদ

    সাক্ষাৎকারকি

    স্যাটায়ার

    
    Top