রুহামনামা ২ : ওবাকের বাচ্চারা যখন মেঘের উপর গোসল করে, তখন যে পানি গড়িয়ে পড়ে ওটাই বৃষ্টি

৬৬৬ পঠিত ... ০৪:০৪, জানুয়ারি ৩০, ২০১৯

[ছড়াকার রোমেন রায়হানের এগারো বছর বয়সী একমাত্র সন্তান রুহাম। একমাত্র হওয়ার কারণে রুহামের সারাদিনের গল্প, স্কুলের গল্প, বন্ধুদের গল্প সবই তার বাবা-মায়ের সাথে। হুট করে একদিন রুহামের বাবা খেয়াল করলেন, ছেলের কার্যকলাপ কিংবা কথাবার্তা তো বেশ মজার! তবে সমস্যা একটাই, রুহামের প্রতিদিনের মজার কর্মকান্ড দিন না ফুরোতেই তিনি ভুলে যাচ্ছেন। তাই পাঁচ বছর আগে হঠাৎ করেই একদিন সিদ্ধান্ত নিলেন, রুহামের পাকামি, বোকামি, দুষ্টুমিগুলো লিখে রাখার। রুহামকেন্দ্রিক সেই রচনাগুলো নিয়েই 'রুহামনামা'। যা পড়লে আপনি কখনো হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়বেন, নিজের ছোটবেলার কথা মনে পড়বে, অবাক হবেন বা কখনো মমতায় আপনার হৃদয় আর্দ্র হয়ে উঠবে।--সম্পাদক] 

 

পড়ালেখা

আমার মা আমার বাসায় বেড়াতে এসেছেন। সকাল বেলায় আম্মা তার নাতি রুহামকে পড়াশোনা বিষয়ে জ্ঞান দিচ্ছেন...

দাদী: শোনো রুহাম, তোমার বাবা এই যে এত বড় ডাক্তার হয়েছে (আম্মার ধারণা আমি অনেক বড় ডাক্তার হাহাহাহা) কীভাবে জানো?
রুহাম : কীভাবে?
দাদী : ও খুব সকালে উঠে পড়াশোনা করতো... তারপরে নাস্তাখেতো। তুমিও নাস্তা খাওয়ার আগে পড়বে। ঘুম থেকে উঠে আগে পড়া, তারপর নাস্তা। বুঝেছ?
রুহাম : দাদু, নাস্তা খাওয়ার আগে পড়লে কী হয়?
দাদী : আগে পড়াশোনা করে তারপর নাস্তা খেলে পড়া খাবারের নিচে থাকে বলে মনে থাকে...
রুহাম : ও!... তাহলে কাক্কা (জাপানী ভাষায় টয়লেট করাকে কাক্কা বলে। রুহাম এখনও এই টার্ম ব্যবহার করে) দিলেই তো পড়া শেষ! 

আম্মা লজিক খুঁজতে গিয়ে স্তব্ধ।

আম্মা, আমাদেরকে যেই ভুজুং ভাজুং দিয়ে পড়িয়েছেন সেই ভুজুং ভাজুং কি আর এই কালে চলে?!

 

আরবী শিক্ষক 

বিকেল ৪টা বাজে। রুহাম দৌড়ে এসে মাকে বলল

রুহাম : আম্মু ফুল হাতা প্যান্ট আছে?
রুহামের আম্মু : ফুল হাতা প্যান্ট আবার কোনটা?
রুহাম : ওই যে...
রুহামের আম্মু : কী দরকার?
রুহাম : ওই যে আরবি টিচার... কী যেন বলে?
রুহামের আম্মু : হুজুর?
রুহাম : হু। হুজুর এসে পড়বে আরবি পড়ানোর জন্য... তাড়াতাড়ি একটা ফুলহাতা প্যান্ট দাও।

গত সপ্তাহ থেকে রুহামকে আরবী পড়ানোর জন্য একজন আরবী শিক্ষককে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। এক ঘণ্টা করে সপ্তাহে দুই দিন পড়াবে। প্রথম দিন পড়া শেষে রুহামের কাছে জানতে চাইলাম

আমি : কী রে রুহাম! হুজুরের কাছে কী পড়লি?
রুহাম : আলিফ খালি... বে এর নিচে এক নোক্তা...
আমি : বাহ ভাল তো!
রুহাম : জানো বাবা! হুজুর আমাকে জিজ্ঞেস করছিলো... আল্লাহ কোথায় থাকে?
আমি : তুই কী বললি?
রুহাম : আমি বলেছি, হ্যাভেন-এ থাকে। হুজুর বলেছেন ঠিক হয় নাই।
আমি : তাহলে?
রুহাম : সাত আসমানের উপর থাকে।
আমি : ওহ!
রুহাম : বাবা এটা কি আমাদের এই সাত তলা বিল্ডিঙের মত? লেয়ার বাই লেয়ার?
আমি : (আলোচনা অন্য দিকে নেবার জন্য) হুজুরের কাছ থেকে আর কী শিখলি?
রুহাম : বুঝছ বাবা! আল্লাহ আমাদেরকে পানি থেকে বানিয়েছে...
আমি : হুজুর বলেছে?
রুহাম : হু... বাট প্রথম মানুষ আছে না! ঐ যে অ্যাডাম, ওকে কিন্তু মাটি থেকে বানিয়েছিল।
আমি : তাই নাকি?
রুহাম : হু। পানি থেকে বানিয়েছে বলেই আমাদের পেট কাটলে রক্ত বের হয়। কিন্তু অ্যাডামের পেট কাটলে কী বের হত জানো?
আমি : কী?
রুহাম : বালি। ওকে মাটি দিয়ে বানিয়েছিলো তো! 

রুহাম হুজুরের কাছ থেকে আর কী কী শেখে তা জানার জন্য আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছি। 

 

মাথা বানানো

রুহামকে সেলুনে নেয়া হয়েছে মান্থলি রুটিন চুল কাটানোর জন্য। স্কয়ার-কাট না কি যেন একটা কাট দেয়া হল। নাপিতের মনে তামশা করার ইচ্ছা জেগে ওঠায়...

নাপিত : কী বাবু, মাথা বানায়া দিবো?
রুহাম : তোমাকে মাথা বানাতে হবে কেন? আল্লাহই তো মাথা বানিয়ে দিয়েছে!

 

ওবাকে 

রুহামের বয়স তখন তিন বা সাড়ে তিন। বাবা মা দুইজনেই পিএইচডি নামক রসগোল্লার পিছনে ছুটছে। তাই সকাল ৯টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত রুহামকে থাকতে হয় জাপানের ডে কেয়ারে। ওখানে রুহাম নানান কিছু শেখে, চেনে। বাংলাদেশের মত জাপানি বাচ্চারাও ডে কেয়ারে ভূত চিনে ফেলে। জাপানে বাচ্চাদের চিন্তায় দুই ধরণের ভূত আছে। একটা হল ফ্রেন্ডলি ঘোস্ট- মানে হল বন্ধু ভূত। জাপানি ভাষায় এটা হল ‘ওবাকে’। আরেক ধরণের ভূত আছে, ভয়ংকর। জাপানি ভাষায় সেটা হল ‘ওনি’। জাপানি বাচ্চারা ওনিকে বেশি ভয় পায় আর ওবাকের বেলায় কাজ করে পছন্দ আর অল্প ভয়ের মিশেল। রুহামের বেলায়ও ঐ বয়সটা জুড়েই ছিল ওবাকে। ওকে যা-ই জিজ্ঞেস করা যেত তাতেই ওবাকে উপস্থিত। আমি ওর আই-কিউ টেস্ট করছি

আমি : বল তো রুহাম, বৃষ্টি কীভাবে হয়!
রুহাম : এটা তো সোজা। ওবাকের বাচ্চারা যখন মেঘের উপর গোসল করে তখন যে পানি গড়িয়ে পড়ে ওটাই বৃষ্টি।
আমি : বাহ বেশ। তাহলে বলতো স্নো কীভাবে হয় (উল্লেখ্য, আগের সপ্তাহেই আমাদের নাগোয়া শহর স্নো পড়ে শাদা হয়ে গিয়েছিল)
রুহাম : স্নো?
আমি : হুম।
রুহাম : (একটু ভেবে) ওবাকের আম্মু পুডিং বানানোর জন্য বিটার দিয়ে দুধ বিট করে (রুহাম ওর আম্মুকে দেখেছে এই কাজ করতে)। বিট করার সময় কিছু দুধ বাইরে পড়ে যায়। ঐ দুধই স্নো হয়ে পড়ে।আমি : (আমি রীতিমত মুগ্ধ। এরপর কী আসে দেখার জন্য) তাহলে ‘খামেনরি’ (জাপানি ভাষায় খামেনরি, বাংলায় বজ্রপাত) কীভাবে হয়?
রুহাম : (হেসে) ওবাকে যখন জোরে তালি দেয় তখন খামেনরি হয়।

 

[রুহামের সর্বমোট ৮০টি নানা ধরণের কর্মকান্ডের গল্প নিয়ে চন্দ্রাবতী প্রকাশনী থেকে এবারের বইমেলায় প্রকাশিত হয়েছে বই 'রুহামনামা'। ঘরে বসে পেতে চাইলে কিনতে পারেন রকমারি ডটকম থেকে।] 

আরও পড়ুন-

রুহামনামা ১ : চায়নার ধুলা গড়িয়ে এসে আমাদের দেশে পড়ে বলেই কি বাংলাদেশে এত ধুলা?

৬৬৬ পঠিত ... ০৪:০৪, জানুয়ারি ৩০, ২০১৯

আরও

পাঠকের মন্তব্য

 

ইহাতে মন্তব্য প্রদান বন্ধ রয়েছে

আপনার পরিচয় গোপন রাখতে
আমি নীতিমালা মেনে মন্তব্য করছি।

আইডিয়া

গল্প

সঙবাদ

সাক্ষাৎকারকি

স্যাটায়ার


Top