ভুলোমনা লোকটি

৭৮১ পঠিত ... ২০:৫৪, অক্টোবর ২১, ২০১৮

 

‘মনে থাকে যেন, বৃহস্পতিবার। আবার বুধবারে চলে আসিস না যেন।’

‘বুধবার আসতে পারব না।’ হেসে বলল ম্যাক। ‘ওই দিন ম্যানশনস হাউসে থাকব। আর শুক্রবার যাব স্কটল্যান্ডে। এবার ভুল হওয়ার সুযোগই নেই। তবুও আমি ডায়রিতে লিখে নিচ্ছি।’

 

বুধবার। অতিথিরা সবাই চলে এসেছে। কিন্তু ম্যাকের দেখা মিলল না। অগত্যা ওকে ছাড়াই সবাই খেয়েদেয়ে বিদায় নিল।

 

শুক্রবার। সোয়া আটটার সময় হন্তদন্ত হয়ে ম্যাক হাজির।

‘স্যরি। দেরি হয়ে গেল। হাঁদারাম ট্যাক্সি ড্রাইভার...’

রেগে বললাম, ‘কেন এসেছিস?’

ম্যাক হাসতে হাসতে বলল, ‘আমার না দাওয়াত?’

‘যা, অন্য কোথাও গিয়ে খা।’

‘মানে?’

‘আমি তোকে বুধবার আসতে বলেছিলাম। আর তোর না আজ স্কটল্যান্ডে যাওয়ার কথা?’

‘ইস্! একদম ভুলে গেছি।’

যে ট্যাক্সিতে করে সে এসেছিল, সেটার পেছনেই আবার ছুটতে শুরু করল।

 

তবে আরও বিপদ হতো, যখন সে কাউকে দাওয়াত দিত। এমনি একদিন আমরা দুজন ম্যাকের হাউস বোটের কিনারে পা ঝুলিয়ে বসে আছি। হঠাত্ দেখি ছোট্ট দুটি নৌকা। একেকটিতে ছয়জন করে লোক বসা। তারা আমাদের দিকে তাদের রুমাল নাড়াতে লাগল।

‘এই, এরা কারা?’

‘মনে হয় পিকনিকে এসেছে।’

নৌকাগুলো আরও কাছে আসতে লাগল এবং একটা লোক গলুইয়ের ওপর উঠে আমাদের দিকে তাকিয়ে চেঁচাতে শুরু করল।

‘হায় হায়, ভুলেই গিয়েছিলাম!’ হঠাত্ ডুকরে উঠল ম্যাক।

‘কী হলো?’

‘আরে, এরা আমার বন্ধু। আমি ওদের ডেকেছিলাম লাঞ্চে। নৌকায় দুটো মাটন চপ আর কয়েকটা আলু ছাড়া কিছুই নেই। কাজের ছেলেটিকেও ছুটি দিয়ে দিয়েছি।’

 

আরেক দিন দুপুরবেলা। আমরা কজন মিলে আড্ডা দিচ্ছিলাম হোটেলে। হঠাত্ ম্যাক এসে বলল, ‘দুপুরে কী করছিস?’

‘তেমন কিছু না।’

‘তাহলে আমার সঙ্গে চল। আমি লিনাকে নিয়ে রিচমন্ডে যাচ্ছি।’ (লিনা ছিল ম্যাকের বাগদত্তা। পরে আমরা জানতে পারি, ম্যাকের ওই একই সময়ে মোট তিনজনের সঙ্গে বাগদান হয়েছিল, কিন্তু বাকিদের কথা সে ভুলে গিয়েছিল।) আমার গাড়ির পেছনে একটা সিট আছে।

হিলার্ড বলল, ‘আমি যাব।’

একটু পরেই দেখি হিলার্ড মুখ হাঁড়ি করে স্মোক রুমে বসে আছে।

‘তোর না ম্যাকের সঙ্গে রিচমন্ডে যাওয়ার কথা?’

‘গিয়েছিলাম।’

‘তাহলে? গাড়ির কলকবজা নষ্ট হয়ে গেছে?’

‘গাড়ির না। আমার। আমরা পাহাড়ের ওপর দিয়ে গাড়ি চালিয়ে যাচ্ছিলাম। হঠাত্ ম্যাক একটা বাঁক নিল। গাড়িটা ধাক্কা খেল একটা ল্যাম্পপোস্টের সঙ্গে। তারপর আর কিছু মনে নেই। শুধু মনে পড়ছে, আমি বসে ছিলাম রাস্তার মাঝখানে। রাস্তাভর্তি লোক দাঁত কেলিয়ে তাকিয়ে ছিল আমার দিকে। আমাকে ফেলেই ম্যাকের গাড়ি এগিয়ে গেল। প্রায় পৌনে এক মাইল আমি রাস্তার কিছু ছেলেপেলেসহ গাড়িটিকে পেছন থেকে চেঁচিয়ে ধাওয়া করলাম। ব্যাটা শুনলই না। শেষমেশ বাসে করে ফিরে এলাম।

 

সেদিনই সন্ধ্যায় ম্যাকের সঙ্গে থিয়েটারে দেখা। আমাকে দেখেই সে বলল, আমি কি হিলার্ডকে নিয়ে রিচমন্ডে গিয়েছিলাম?

‘হ্যাঁ।’

‘লিনাও তা-ই বলছিল। কিন্তু আমরা যখন হোটেলে পৌঁছাই ও আমাদের সঙ্গে ছিল না। তুই ওকে পথেই ফেলে এসেছিস।’

‘সে কি! আমার তো কিছুই মনে নেই।’

 

আমরা ধরেই নিয়েছিলাম, ম্যাকের কোনো দিন বিয়ে হবে না। কারণ, কবে, কোথায়, কার সঙ্গে—এত কিছু একসঙ্গে সে মনেই রাখতে পারবে না। অবশ্য হিলার্ড বলত, ম্যাক আসলে বিবাহিত কিন্তু ওর সেটাও মনে নেই। ভাগ্যের কেরামতিতে ম্যাকের বিয়ে হলো। কনেকে দেখে হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম—যাক, একে কেউ ভুলতে পারবে না।

 

সেবার স্কটল্যান্ড থেকে ফেরার পথে স্কারবোরোর একটি হোটেলে কিছুদিন ছিলাম। একদিন বাইরে বেরিয়েছি হাঁটতে। ঝুম বৃষ্টি। হঠাত্ জবুথবু হয়ে বসে থাকা একটি লোকের সঙ্গে ধাক্কা খেলাম।

‘সরি।’

‘তুই?’

‘ম্যা-ক! তুই এখানে কী করিস? একদম ভিজে গেছিস দেখছি।’

‘সৃষ্টিকর্তার দোহাই, আমাকে অন্য কোথাও নিয়ে চল, কিছু খাওয়া।’

‘তোর কাছে টাকা নেই?’

‘ফুটো পয়সাও না। বউকে নিয়ে এসেছিলাম। স্টেশনে মালপত্র রেখে গেলাম অ্যাপার্টমেন্ট খুঁজতে। বাসা পাওয়ার পর বউকে রেখে একটু হাঁটতে বেরোলাম। এখন পথ ভুলে গেছি। কোন বাসা, কী ঠিকানা কিছুই মনে নেই। মনে হয়, আর কোনো দিন ওর সঙ্গে দেখা হবে না।’

‘লজিং হাউসগুলোতে খুঁজেছিস?’

‘খুঁজিনি মানে? সব বাড়িতেই আমার মুখের ওপর দরজা লাগিয়ে দিল। এক পুলিশকে সব বললাম। ব্যাটা হেসেই শেষ।’

 

পরদিন এক উকিলকে গিয়ে সব খুলে বললাম এবং তার অনুসন্ধান শেষে ম্যাক খুঁজে পেল তার স্ত্রীসহ অ্যাপার্টমেন্ট।

‘তোর বউ কী বলেছিল রে?’ এরপর ম্যাকের সঙ্গে দেখা হলে তাকে জিজ্ঞেস করলাম।

‘যা ভেবেছিলাম, তা-ই।’

ম্যাক অবশ্য আমাকে বলেনি, সে কী ভেবেছিল।

 

জেরোম কে জেরোম: মার্কিন লেখক। তাঁর বিখ্যাত রচনা থ্রি ম্যান ইন এ বোট। জন্ম ১৮৫৯, মৃত্যু ১৯২৭।

 অনুবাদ: আলিয়া রিফাত 

৭৮১ পঠিত ... ২০:৫৪, অক্টোবর ২১, ২০১৮

আরও

পাঠকের মন্তব্য

 

ইহাতে মন্তব্য প্রদান বন্ধ রয়েছে

আপনার পরিচয় গোপন রাখতে
আমি নীতিমালা মেনে মন্তব্য করছি।

আইডিয়া

গল্প

সঙবাদ

সাক্ষাৎকারকি

স্যাটায়ার


Top