বঙ্কিমচন্দ্র যদি 'কমলাকান্তের জবানবন্দি' এই যুগে লিখতেন

১৮২২পঠিত ...১৮:৩২, ফেব্রুয়ারি ০৯, ২০১৮

সাহিত্যের ভাষা হিসেবে বিশ শতকের আগে সাধু রীতিই প্রচলিত ছিল। গত শতকে চলিত জনপ্রিয় হয়ে উঠল। আর এখন যখন ফেসবুকের পোস্টে পোস্টে যেমন সাহিত্যের নিদর্শন (!) দেখা যায়, তেমন ভাষায় আমাদের বাংলা সাহিত্যের জনপ্রিয় নিদর্শনগুলো কেমন রূপ পেত? কমলাকান্তের জবানবন্দি যদি ফেসবুক সেলিব্রেটি বঙ্কিমচন্দ্র লিখতেন, তা কেমন হত, মাসউদ ফোরকান-এর সৌজন্যে দেখা যাক এমনই একটি নিদর্শন থুক্কু স্যাম্পল!

অলংকরণ: হাসিব কামাল

সেই হিরোইঞ্চি কমলাকান্তের কোন খোঁজখবর নাই কতদিন হল। কত জায়গা ঘাটছি। পাই না, পাই না। হঠাৎ কোর্টে দেখলাম। লাস্ট দেখছিলাম মনে হয় রমনা পার্কে। মনের সুখে গাঁজা টানতেছিল। কোর্টে ওরে দেখেই বুঝলাম, মাল টানতে যেয়ে টাল হয়ে গেছিল, ধরা খাইছে পুলিশের কাছে। ওরে তো আমি চিনি। ওর পকেটে দশ টাকা থাকলেও, জীবনে গাঁজা ছাড়া ভালো কিছু খাইবো না। ধরা খাইলে পুলিশরেও দিবে না, ওইটা দিয়েও পরে গাঁজা খাইবো! চিন্তা করবে ঐ টাকায় কয়টা বিড়ি টানা যায়। যাই হোক, কোর্টে কী কাহিনী হয় দেখতে আমিও বইসা গেলাম দর্শক সারিতে। কারণ অয় যে বিনোদন দিবে, এইটা মাস্ট!

একটু পরে বুঝলাম,প্রসন্ন গোয়ালিনির গরুর ফেসবুক ফ্যান পেজ কে জানি হ্যাক করছে, কমলারে সাক্ষী বানাইছে। যেই তারে সাক্ষীর কাঠগড়ায় দাড় করানো হইলো, সে দাঁত বের করে খিক খিক করে থুতু ছিটাইয়া সেইরকম একটা ভেটকি মারলো!

চাপরাশি ধমক দিলেন, হাসো ক্যান? ফাইজলামি?

কমলাকান্ত বলল, 'ছোটবেলায় বাংলা সিনামা দেখতাম। এই কাঠগড়ায় কতজন যে তার ফাঁসির রায় শুনলো। আমি কিচ্ছু করি নাই। আমি নির্দোষ। তারপর ৩০২ ধারায় দিল ঝুলায়। আর না হয় বিশ বছর জেল খাটে। শেষ মুহূর্তে কোন সাক্ষী দৌড়ায় চলে আসলে বেকুসুর খালাস। তারপর ব্যাপক সুখ-শান্তি। লাস্ট সিনে পুরা পরিবার নিতে আসে, হ্যাতে জেলেত্তে মুক্তি পায়! সেইরকম সিনারি...'
চাপরাশি বললো, 'শুনো, আদালত নিয়া ট্রল করবা না। হলফ পড়ো, আমি পরমেশ্বরকে প্রত্যক্ষ করে...'

কমলাকান্ত বলল, 'কী! কী বলবো? ঈশ্বরকে চোখে দেখে শপথ করমু? কেমনে কী ম্যান! এত যে গাঞ্জা খাইলাম, তাও তো হ্যারে দেখি টেখি না, আপনেরা এমুন ক্যান?'
হাকিম- হ্যাঁ, সমস্যা কী এতে?
কমলাকান্ত পরে স্ট্যাটাস দেবে এই চিন্তায় হাতে থাকা মোবাইলের নোট অপশনে লিখে রাখলো, 'মাথায় ঘিলু থাকলে জীবনে জাতের কিছুই করতা তুমি। অর্ডার-অর্ডার কইয়া চিল্লাইতা না।'
হাকিম: কী বলতে চাও তুমি? স্ট্রেইটকাট বলো তো, প্যাড়া দিও না!
কমলা – হুজুর,আপনি জোস এটা আমি মানি। কিন্তু ঈশ্বরকে চোখে দেখছি, এইটা কেমনে বলি? উনাকে কি চোখে দেখা যায়! মজা নেন? এমনিতেই মাইনসে কয় আমি নেশা করি তার মধ্যে এইগুলা কইলে তো...

হাকিম তো রাইগা ফায়ার হইলোই, এইবার উকিল বাবুও সেই চেতা চেইতা গেলো। তার টাইমের দাম আছে। মিনিটে মিনিটে যখন টাকা পয়দা করে সে, এসব **ছাল শোনার টাইম কই! সে কমলাকান্তরে বললো, 'দাদা, এইযে ডায়লগটা দিলেন, এইটা ব্রাহ্মসমাজের গ্রুপে পোস্ট দিলে, অসাম যাইত। দেখতেন হাজার হাজার লাইকও না, সবগুলা লাভ পড়ছে! কোর্টে এইসব কথা কইলে সোজা ব্লক খাইবেন।'
কমলা- মামা, তুমি যে উকিল এইটা বোঝাই যাচ্ছে। টাইমের ফাপড় নেও? আর ক্লায়েন্ট আসলে তখন ইশ্বরকে চোখে দেখ। আর কত কী দেখো, কে জানে!

উকিল জাস্ট চিল্লায় উঠলো, I ask the protection of the court against the fu*king insult of this witness. He is real a**h*le.

কোর্ট বলল- The witness is your own. If u want to dumb him, it’s up to you.

এখন কমলা হলো নিজের লোক। ভাগায় দিলে কেস শ্যাষ। উকিল তাই চাপা ক্ষোভটা চেপে গেল।

মুহুরি শপথ বাক্য পাঠ করালো। `যাহা বলিব,সত্য বলিব। জেনেশুনে কোনো তথ্য গোপন করিব না।`

কমলাকান্ত বলল, 'আইসসালা, অস্থির তো! লাইনটা ভাল্লাগছে।'

উকিল চোখ বড় করে বলল, 'যা জিজ্ঞেস করি এখন, সোজা উত্তর দিবা। কাবজাব কইরো না। আরো কাজ আছে'

কমলা বলল, 'আর কিছু বলার সুযোগ নাই? ভাবছিলাম জীবনে মানুষের সামনে কিছু বলার সুযোগ পাইলে কোপায়া দিমু একেবারে। ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়া লাইক পায়া আর কত। আমি লাইভে বাণী দিতেছি আর পাবলিক তালি মারতেছে। জাস্ট ওয়াও।'

উকিল- বাঁজে বইকো না।
কমলা এইবার হাকিমের দিকে একটা লুক দিল। বললো, 'ধর্মাবতার, কিছুক্ষণ আগে বললেন যাতে কিছু না লুকাই। এখন অয় এসব কী বলে? আজকে বেসবাবার কনসার্ট আছে। মাল খাওয়ার টাকা দিয়ে টিকিট কিনছি। জীবনের পর্থম। এটা বলব না? তাহলে কী বলবো?

অলংকরণ: হাসিব কামাল

উকিল- তোমারে যেইটা জিগাই,ওইটা কইবা। পকপক কম কর। তোমার নাম, বাপের নাম এগুলা বল।
কমলা- শ্রীকমলাকান্ত চক্রবর্তী।
বাপের নামও বলল সে।
উকিল - তুমি কোন জাতীয়?
কমলা- বাঙ্গালি না বাংলাদেশি,ওটা জিগাইলেন নাকি আমি আসলেই হিন্দু কিনা জিগাইলেন?
উকিল- আঃ! বুঝছি হিন্দু। তো কোন বর্ণ?
কমলা- কয়দিন `ফেয়ার অ্যান্ড হ্যান্ডসাম` মাখসি। কাজ হয় নাই। লোকে বলে কালো,মায়ে কয় উজ্জল শ্যামলা। আপনি যেটা ভালো বোঝেন।
তখন হাকিম বলল, 'আমিও কিন্তু ফেড-আপ! বাপ, এইটা কোর্ট। ঘাড়ত্যাড়ামি কর কেন? ভালো করে বলে দিলেই তো পারো।`
কমলা- ফেসবুকের লিংকটা দেই, ইনফো দেইক্ষা নেন, তাইলেই তো হয়। আপনেরাও তো কাহিনী করেন বেশি মিয়া!
উকিল- বয়স?
কমলা- আসলটা, ফেসবুকেরটা, নাকি সার্টিফিকেটেরটা?
উকিল- সার্টিফিকেট।
কমলা- দেখলেন তো? আসলটার বেইল নাই। সব জায়গায় অসঙ্গতি। দুই নম্বরি চলে। যাই হোক, ৫১ বছর, ২ মাস, ৪ দিন, ১৩ ঘন্টা, পাঁচ মিনিট...
উকিল- তোমার ঘড়ি যে রোলেক্স ব্র্যান্ডের, ঘড়ি দেখায়া ফাপড় নিলা মনে হয়? তুমি গাঞ্জাবাবা গুলিস্তানে দুইশ টাকার রেপ্লিকা কিইন্যা মিনিট ঘন্টার ফুটানি দেখাও? বাড়ি কই?
কমলা- ফুটানি না বস, ওইটা শাহরুখের দিলওয়ালে মুভির ডায়লগেত্তে মারছিলাম! যাই হোক, আমি ভ্যাগাবন্ড। বাড়ি নাই। ব্যাচেলর বলে আমাকে নিজের বাড়ি থেকেই বের করে দিসে। এলাকার মুরব্বিরা সালিশে কইলো, এলাকায় কোন ব্যাচেলর থাকতে পারবেনা।
উকিল- তো খাও কীভাবে?
কমলা- ডাল-ভর্তা-ভাত খাই হাত দিয়ে। বিড়ি টানি। আর ছাইপাস মাঝেমধ্যে গিলি।
উকিল- তো, ডাল-ভাত কোথা থেকে আসে?
কমলা- ভগবানে দিলে খাবার আসে। এখন আকাশ থেকে আসে না বাজার থেকে আসে, এটাও জিগাবেন?
উকিল- টাকা কামাও?
কমলা-ফুটা পয়সাও না।
উকিল- ফেসবুকে ক্যান্সার রোগীর টাকা কালেকশন ইভেন্টের নামে বাটপারি কইরা টাকা কালেক্ট করো?
কমলা- ওইসব অভ্যাস নাই। আমি ফেসবুকে ইরেগুলার।
উকিল- চুরি কর না ডাকাতি কর তাহলে?
কমলা- তাহলে তো ধরা খাইতামই অনেক আগে। পুলিশরে কিছু দেয়া লাগত, আপনার পকেটেও কিছু যাইত।

উকিল তখন কোর্টে বলল, 'মাফ চাই বাপ। তুই মর। আমার সাক্ষীর দরকার নাই। ক্ষ্যামা দে।

১৮২২পঠিত ...১৮:৩২, ফেব্রুয়ারি ০৯, ২০১৮

আরও

পাঠকের মন্তব্য

 

    ইহাতে মন্তব্য প্রদান বন্ধ রয়েছে

    আপনার পরিচয় গোপন রাখতে
    আমি নীতিমালা মেনে মন্তব্য করছি।

    আইডিয়া

    গল্প

    সঙবাদ

    সাক্ষাৎকারকি

    স্যাটায়ার

    
    Top